নির্বাচন ঘিরে সরগরম রাজনীতি, বিএনপি-জামায়াতসহ বিভিন্ন দলের প্রস্তুতি জোরদার
দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় ডিসেম্বর, আর নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী তফসিল ঘোষণা হতে পারে অক্টোবর মাসে। ভোটের সাইরেন বাজতে এখনও প্রায় ৮ মাস বাকি, তবে ইতোমধ্যেই দেশের রাজনীতিতে নির্বাচনি উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণঅধিকার পরিষদসহ বিভিন্ন দল নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রস্তুতি জোরদার করেছে।
দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে জনগণ ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত থাকার অভিযোগে এবারের নির্বাচনের প্রতি সাধারণ ভোটার ও রাজনৈতিক দলগুলোর আগ্রহ বেশি। বিশেষ করে, ভোটারদের মন জয় করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠে তৎপর হয়েছেন।
বিএনপির নির্বাচনি প্রস্তুতি: তৃণমূলে কর্মসূচি ও প্রার্থী তালিকা চূড়ান্তের কাজ চলছে
বিএনপি ইতোমধ্যে ৩০০ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী নির্বাচনের কাজ শুরু করেছে। দলের সিনিয়র নেতারা বিভিন্ন নির্বাচনি এলাকায় নিয়মিত সফর করছেন। আজ থেকে ৬৭ সাংগঠনিক জেলায় ধারাবাহিকভাবে সমাবেশ শুরু করছে বিএনপি। পরে মহানগর ও বিভাগীয় শহরগুলোতেও এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।
দলটির শীর্ষ নেতাদের মতে, এবারের নির্বাচনে বিএনপি তরুণ, অভিজ্ঞ ও প্রবীণদের সমন্বয়ে শক্তিশালী প্রার্থী তালিকা তৈরি করবে। যেসব নেতা মাঠপর্যায়ে জনপ্রিয়, দলের প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছেন এবং বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন, তাদের প্রাধান্য দেওয়া হবে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলের শীর্ষ নেতারা নির্বাচনি স্লোগান ও কৌশল ঠিক করছেন। জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে বিএনপি জনগণকে আকৃষ্ট করতে নতুন কিছু চমক নিয়ে আসবে।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, “গত ১৫ বছর ধরে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। মানুষ দ্রুত জাতীয় নির্বাচন চায়। প্রধান উপদেষ্টাও বলেছেন, ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের জন্য কাজ চলছে। বিএনপি একটি গণতান্ত্রিক ও নির্বাচনমুখী দল। যে কোনো সময় নির্বাচন হলে আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে।”
তিনি আরও জানান, বিএনপি ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে। তবে দলটি এককভাবে নির্বাচন করবে নাকি জোটগতভাবে যাবে, সেটি এখনই বলা যাচ্ছে না। তফসিল ঘোষণার পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা হবে, তারপর সিদ্ধান্ত আসবে।
জামায়াতে ইসলামীর তৎপরতা: ৭৯ আসনে প্রার্থী ঘোষণা, সব আসনে লড়াইয়ের পরিকল্পনা
বিএনপির মতো জামায়াতে ইসলামীও এবার নির্বাচনে ব্যাপকভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। দলটি ইতোমধ্যে ৭৯ আসনে সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে এবং তারা ৩০০ আসনেই প্রার্থী দিতে চায়।
জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান ইতোমধ্যে ৪০টির বেশি জেলা সফর করেছেন এবং তৃণমূল নেতাকর্মীদের নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। দলের কেন্দ্রীয় নেতারাও বিভিন্ন জেলায় কর্মিসভা ও সাংগঠনিক সভায় অংশ নিচ্ছেন।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, “আমরা সব আসনে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। নির্বাচনের নানা সমীকরণ হবে, পোলারাইজেশন হবে। দুই বা পাঁচ দল কিংবা ইসলামি দলগুলোর মধ্যে জোট হতে পারে। তখন কিছু ছাড়ার প্রয়োজন হলে আমরা ছাড়ব; কিন্তু আমরা সব আসনের জন্য প্রস্তুত।”
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব জানিয়েছে, ‘এ’ ক্যাটাগরির ৫০টি, ‘বি’ ক্যাটাগরির ৫০টি আসন চিহ্নিত করে সেখানে শক্তভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব আসনে দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা নির্বাচনি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
নতুন দলের আবির্ভাব ও ছোট দলগুলোর পরিকল্পনা
এবারের নির্বাচনে ছাত্রনেতাদের নতুন একটি দলের অংশগ্রহণ নিয়েও আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। জাতীয় নাগরিক কমিটির মুখপাত্র সামান্তা শারমিন বলেছেন, “আমাদের নতুন দল আসছে। আমরা আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনেই প্রার্থী দিতে চাই। সে প্রস্তুতি আমরা নিচ্ছি এবং সেভাবেই এগোচ্ছি।”
এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, গণঅধিকার পরিষদ, এবি পার্টি ও অন্যান্য ছোট দলগুলোরও পরিকল্পনা রয়েছে সব আসনে প্রার্থী দেওয়ার।
নির্বাচনের আগে বিরোধী জোট গঠনের সম্ভাবনা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, ততই রাজনৈতিক সমীকরণ বদলাবে। বিএনপি ও জামায়াতের একাধিক নেতা জানিয়েছেন, বিএনপি-জামায়াত-ছাত্রনেতাদের নতুন দলসহ মিত্ররা একসঙ্গে থাকবে কি না, তা নির্ভর করবে আওয়ামী লীগ ভোটে আসবে কি না তার ওপর।
বিএনপি চায়, ২০১৮ সালের মতো একটি বৃহৎ বিরোধী জোট গঠন করে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে ভোটে অংশ নিতে। অন্যদিকে জামায়াত চায়, প্রত্যেক আসনে ইসলামি দলগুলোর একজন করে প্রার্থী থাকুক।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেছেন, “আমরা একটি নির্বাচনমুখী দল। যে কোনো সময় নির্বাচন হলে আমাদের প্রস্তুতি আছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এলাকায় কাজ করছেন।”
দলের অন্য এক সিনিয়র নেতা জানান, বিএনপি যেহেতু একটি বড় রাজনৈতিক দল, তাই একেকটি আসনে অনেক প্রার্থী থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তবে দলের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবার কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও চূড়ান্ত চিত্র জানতে অপেক্ষা তফসিল ঘোষণার
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে বিএনপি, জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলো চূড়ান্ত কৌশল নির্ধারণ করবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আগামী নির্বাচন ঘিরে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নতুন জোট গঠনের সম্ভাবনা রয়েছে।
এখন দেখার বিষয়, বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলো শেষ পর্যন্ত জোটবদ্ধ হয়ে ভোটে অংশ নেয়, নাকি এককভাবে লড়াই করে? সব উত্তর মিলবে নির্বাচন কমিশনের তফসিল ঘোষণার পর।