রমজান ঘিরে গার্মেন্টসে অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা, ভারতীয় মিডিয়ার অপপ্রচারেও প্রভাব - দিগন্ত জার্নাল

রমজান ঘিরে গার্মেন্টসে অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা, ভারতীয় মিডিয়ার অপপ্রচারেও প্রভাব

দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:

গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে গার্মেন্টস শিল্পে নতুন করে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। সরকারের একটি বিশেষ সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বিদায়ি ফ্যাসিবাদ সরকারের পলাতক দোসররা এবং বেক্সিমকো গ্রুপের মতো কিছু প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান এ অস্থিরতার পেছনে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

গত ৫ মাসে ১১৯টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে—এর মধ্যে আশুলিয়া ও গাজীপুরে ৪০টি, নারায়ণগঞ্জে ৩৬টি এবং ঢাকা মহানগরীতে ৩টি কারখানা রয়েছে। একই সময়ে গার্মেন্টস শিল্প এলাকায় ১,১৪৭টি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ৫২টি অগ্নিকাণ্ড, ৭৫টি ভাঙচুর, ২৩৯টি রাস্তা অবরোধ, ৭৭৮টি কর্মবিরতি এবং অন্যান্য ঘটনা রয়েছে।

পরিকল্পিত নাশকতা ও গার্মেন্টস সেক্টরে অস্থিরতার কারণ:
সরকারের প্রতিবেদনে গার্মেন্টস কারখানা বন্ধ হওয়ার ১২টি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
✅ বকেয়া বেতন পরিশোধ না হওয়া
✅ কাঁচামাল সংকট
✅ ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া
✅ শ্রমিক আন্দোলন
✅ শ্রমিক ছাঁটাই ও বেতন বৃদ্ধির দাবি
✅ পার্শ্ববর্তী বন্ধ কারখানার শ্রমিকদের আক্রমণ
✅ হাজিরা বোনাস সংক্রান্ত সমস্যা
✅ গ্যাস সংযোগের সমস্যা
✅ শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত করা

গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের বিরুদ্ধে ভারতীয় মিডিয়ার অপপ্রচার ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে রপ্তানি ক্রয়াদেশ ১০-১৫% কমে গেছে। শুধু সাভার-আশুলিয়া এলাকায় প্রতি মাসে ৮০০-৯০০ কোটি টাকার ঝুট (নিট ফেব্রিকের ছোট টুকরো) ও লেফট-ওভার (ব্যবহার অনুপযোগী কাপড়) চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছে।

শ্রমিকদের মধ্যে ভীতি ও অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা
গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের সহসভাপতি জলি তালুকদার বলেন, পরাজিত রাজনৈতিক শক্তি গাজীপুর ও টঙ্গী এলাকায় বেশি সক্রিয় এবং ‘ভায়োলেন্স ক্রিয়েটার গ্রুপ’ নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে চিহ্নিত একটি গোষ্ঠী টাকার বিনিময়ে অবরোধ, জ্বালাও-পোড়াও ও সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছে।

এদিকে বিজিএমইএর সাবেক সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণেই গার্মেন্টস খাতে সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে বিদেশি ক্রেতারা আস্থা হারাচ্ছে এবং অনেক অর্ডার ভারত ও চীনে চলে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, “যারা আওয়ামী লীগের সমর্থক ছিলেন, তারা এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন, আর সেই সুযোগ নিচ্ছে কিছু শ্রমিক সংগঠন ও আন্তর্জাতিক এনজিও।”

রমজান মাসে আরও বড় অস্থিরতার আশঙ্কা
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, ১ ডিসেম্বর থেকে ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত গাজীপুর-টঙ্গী এলাকায় ১৯৮টি শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনা ঘটেছে, যা মোট ঘটনার ৪৭%।

এদিকে, গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ছাত্রলীগ-যুবলীগসহ দলীয় নেতা-কর্মীরা ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ করত। কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপি-জামায়াতের নেতারা সেই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, যার ফলে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, “শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় অপতৎপরতা সৃষ্টিকারীদের চিহ্নিত করা হচ্ছে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা হচ্ছে।”

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গার্মেন্টস খাতের গুরুত্ব
২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮৪% গার্মেন্টস শিল্প থেকে এসেছে, যার পরিমাণ ৩৬,১৫১.৩১ মিলিয়ন ডলার। বর্তমানে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক এ খাতে কর্মরত, এবং বাংলাদেশের তৈরি পোশাক বিশ্বের ৩০টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

এ অবস্থায়, যদি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ষড়যন্ত্র বন্ধ না হয়, তাহলে গার্মেন্টস শিল্প আরও সংকটে পড়বে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

an adbox will go here