এদেশের বিতর্কিত নির্বাচন: মেয়াদের আগে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে যারা
নিজস্ব প্রতিবেদক । দিগন্ত জার্নাল
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠিত হলেও মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তা ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। নির্বাচন বিতর্কিত হওয়ার কারণে সরকারগুলো জনগণের গ্রহণযোগ্যতা হারায়, যার ফলে গণআন্দোলন, আন্তর্জাতিক চাপ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তারা টিকতে পারেনি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার টানা চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় আসলেও মাত্র ছয় মাসের মাথায় গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়। ৫ আগস্ট তিনি ভারতে পালিয়ে যান, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো সরকারপ্রধানের দেশত্যাগের নজির স্থাপন করে। তবে এর আগেও বাংলাদেশে বিতর্কিত নির্বাচনের পর সরকার মেয়াদ শেষ করার আগেই ক্ষমতা হারিয়েছে। ১৯৮৬, ১৯৮৮, ১৯৯৬ ও ২০০৬ সালের মতো বিভিন্ন সময় এমন ঘটনা ঘটেছে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির টালমাটাল অবস্থা প্রকাশ করে।
১৯৮৬ সালের ৭ মে সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ দেশে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করেন। বিএনপি এই নির্বাচন বর্জন করলেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ অংশ নেয়। নির্বাচনে এরশাদের দল জাতীয় পার্টি ১৫৩টি আসন পায়, আওয়ামী লীগ ৭৬টি ও জামায়াতে ইসলামী ১০টি আসন লাভ করে। তবে শেখ হাসিনা নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেন এবং ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তোলেন। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর নূর হোসেন নামে এক যুবকের পুলিশের গুলিতে নিহত হওয়ার পর সারাদেশে আন্দোলন তীব্র হয়। ওই সময় বিরোধী দলগুলোর সব সংসদ সদস্য একযোগে পদত্যাগ করেন। অবশেষে ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে সংসদ ভেঙে দিতে বাধ্য হন এরশাদ। এরপর ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য বিরোধী দল অংশ নেয়নি। এই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত কম, এবং জাতীয় পার্টি ২৫১টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। তবে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন অব্যাহত থাকে। ১৯৯০ সালে ছাত্র আন্দোলন ভয়াবহ রূপ নেয়, যেখানে লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। ৪ ডিসেম্বর এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়, যা প্রথমবারের মতো শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরের নজির সৃষ্টি করে।
১৯৯৬ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার একতরফা নির্বাচন আয়োজন করলে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীসহ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো তা বর্জন করে। নির্বাচনে বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৯টি আসন পেলেও নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু হয়। এ অবস্থায় টানা আন্দোলনের মুখে ৩০ মার্চ সংসদ ভেঙে দিয়ে পদত্যাগ করেন খালেদা জিয়া। এরপর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১২ জুন একটি নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে এবং শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে বিএনপির মেয়াদ শেষ হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রশ্নে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়। বিএনপি প্রধান উপদেষ্টার পদে তাদের পছন্দের ব্যক্তিকে বসানোর চেষ্টা করলে আওয়ামী লীগ তা মেনে নেয়নি। ফলে আওয়ামী লীগ, ১৪ দলীয় জোট ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল সারাদেশে আন্দোলন শুরু করে। পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করলে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি (ওয়ান-ইলেভেন) সেনাবাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। ফলে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার কার্যত ক্ষমতা হারায়।
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও অধিকাংশ বিরোধী দল অংশ নেয়নি। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২২২টি আসন পায়, তবে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল সন্দেহ প্রকাশ করে। এরপর জুলাই মাসে শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন সহিংস রূপ নেয়। নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে আট শতাধিক মানুষ নিহত হয় এবং হাজারো মানুষ আহত হয়। সরকারের দমন-পীড়ন নীতির ফলে দেশে ব্যাপক ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে শেখ হাসিনা সরকার চরম সংকটে পড়ে যায়। ৫ আগস্ট তিনি ভারতে পালিয়ে যান এবং সরকার কার্যত ক্ষমতাচ্যুত হয়। এর মাধ্যমে আবারও প্রমাণিত হয় যে, বিতর্কিত নির্বাচন জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হলে সরকার টিকে থাকতে পারে না।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে যে, যখনই কোনো দল একতরফা ও বিতর্কিত নির্বাচন আয়োজন করেছে, তখনই তারা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। ১৯৮৬, ১৯৮৮, ১৯৯৬, ২০০৬ ও সর্বশেষ ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর এমন ঘটনা ঘটেছে। এই বাস্তবতা প্রমাণ করে যে, জনগণের অংশগ্রহণ ও আস্থার ভিত্তিতেই একটি সরকার দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। অন্যথায় আন্দোলন, আন্তর্জাতিক চাপ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সরকার টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
[দিগন্ত জার্নাল । সাম্যের আহ্বানে]