সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অনিয়ম ও দুর্নীতি, বঞ্চিত ৫৩.৯% গরিব মানুষ - দিগন্ত জার্নাল

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অনিয়ম ও দুর্নীতি, বঞ্চিত ৫৩.৯% গরিব মানুষ

দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:

সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য তেমন কার্যকর হচ্ছে না, বরং এটি ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে অর্থনৈতিকসংক্রান্ত টাস্কফোর্স। টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ৫৩.৯% দরিদ্র মানুষ এসব কর্মসূচির আওতায় আসতে পারেননি। বরাদ্দ করা অর্থের একটি বড় অংশ ক্ষমতাসীন সুবিধাভোগীদের হাতে চলে গেছে, যা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। ফলে চলমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর সুপারিশ করা হয়েছে। সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে এ সংক্রান্ত খসড়া প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অতীত সরকার বাজেট বাড়িয়ে দেখানোর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অন্তর্ভুক্তিতে বেশ কিছু অপ্রাসঙ্গিক বিষয় যুক্ত করেছে। যেমন সরকারি কর্মচারীদের পেনশন, ভর্তুকি, জাতীয় সঞ্চয়পত্রের সুদ, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা এমনকি অবকাঠামো উন্নয়নকেও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এসব কার্যক্রম প্রকৃত গরিব জনগোষ্ঠীর জন্য তেমন কোনো সুফল বয়ে আনেনি, বরং রাজনৈতিক প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের ‘হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেনডিচার সার্ভে’ অনুযায়ী, দেশের ৫৩.৯% দরিদ্র মানুষ সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় নেই। ফলে যে উদ্দেশ্যে এসব কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে, তা বাস্তবে সফল হয়নি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগী নির্ধারণে অনিয়ম, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রকৃত দরিদ্ররা এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে এই কর্মসূচিগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এসব কর্মসূচির সংখ্যা ১৩৮টি থাকলেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমিয়ে ১১৫টিতে নামিয়ে আনা হয়। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আবার ১৪০টিতে উন্নীত করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৩০টি সরকারি সংস্থা এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে, কিন্তু কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে প্রকৃত উপকারভোগীরা অনেক ক্ষেত্রেই বঞ্চিত হচ্ছেন।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় দেওয়া বিভিন্ন ভাতা মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে এসব ভাতা প্রকৃত গরিব জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কোনো কার্যকর পরিবর্তন আনতে পারছে না। টাস্কফোর্সের সুপারিশে বলা হয়েছে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য একটি নির্ভুল ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে, যাতে প্রকৃত উপকারভোগীদের চিহ্নিত করা যায়। পাশাপাশি সামাজিক বিমাভিত্তিক প্রকল্প চালু করা, শহরের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন কর্মসূচি গ্রহণ করা, জলবায়ু অভিযোজন সংযুক্ত করা এবং এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

সরকারি হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় মোট জিডিপির ২.৫% এবং জাতীয় বাজেটের ১৭%। তবে পেনশনসহ প্রায় ২১টি অপ্রাসঙ্গিক কর্মসূচি বাদ দিলে এই ব্যয় জিডিপির ১.২% এবং বাজেটের মাত্র ৭%-এ নেমে আসে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল নগদ সহায়তা দিয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন সম্ভব নয়। এজন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিকে কর্মমুখী সহযোগিতায় রূপান্তর করা জরুরি।

বিশ্বব্যাংকের এক সেমিনারে সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমিন মোর্শেদ বলেন, বর্তমানে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ৪০-৫০% ভুয়া উপকারভোগী রয়েছেন, যার ফলে বিপুল অর্থ অপচয় হচ্ছে। অনিয়ম দূর করতে ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে. মুজেরী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে চলমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে নানা দুর্নীতি, ফাঁকফোকর ও রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। প্রকৃত দরিদ্ররা বঞ্চিত হলেও মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি অংশ সুবিধা ভোগ করছে। এখন সময় এসেছে এসব ত্রুটি সংশোধন করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রকৃত চাহিদার ভিত্তিতে নতুন পরিকল্পনা গ্রহণের।

an adbox will go here