যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত
দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:
মায়ের ভাষা বাংলার জন্য আত্মদানকারী শহিদদের স্মরণে সারাদেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। রাত ১২টা ১ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং রাত ১২টা ১২ মিনিটে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর দেশের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সাধারণ জনগণ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
প্রভাতফেরির মাধ্যমে শুরু দিবস পালন
বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুরু হয় ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানের সঙ্গে প্রভাতফেরির যাত্রা। কালো পোশাকে শোকের স্মারক বহন করা মানুষজন হাতে ফুল নিয়ে খালি পায়ে ধীরগতিতে এগিয়ে যান শহিদ মিনারের দিকে। সবার কণ্ঠে ছিল কালজয়ী গান— ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’।
কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা
কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার ও আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। মেটাল ডিটেক্টর, আর্চওয়ে বসিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) নির্দেশনায় পোশাকধারী বাহিনীর পাশাপাশি সাদা পোশাকেও নিরাপত্তাকর্মীরা দায়িত্ব পালন করেন।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার শ্রদ্ধা
রাত ১২টা ১ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন প্রথমে শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর ১২টা ১২ মিনিটে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টাকে স্বাগত জানান।
গণঅভ্যুত্থানের ছাপ ও জনগণের অংশগ্রহণ
এবারের একুশে ফেব্রুয়ারি পালিত হয়েছে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের আবহের মধ্যে। শহিদ মিনারের আশপাশের দেয়ালে ভাষাশহিদদের স্মরণে গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে। ব্যানারে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ভাষা আন্দোলনের চেতনা।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে রাত ১২টা ৪০ মিনিট থেকে সর্বস্তরের জনগণের জন্য শহিদ মিনার উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। শিশু থেকে বৃদ্ধ, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শহিদ মিনারে এসে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের শ্রদ্ধা নিবেদন
রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টার পর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও সংগঠন শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এদের মধ্যে ছিলেন—
প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দীন, সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার, সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, শিক্ষক সমিতি, বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন।
জাতীয় নাগরিক কমিটি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক সংগঠন, পরিবেশ আন্দোলনসহ অসংখ্য সংগঠন।
বিএনপির শ্রদ্ধা নিবেদন
বিএনপির পক্ষ থেকে দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা শ্রদ্ধা জানান। উপস্থিত ছিলেন আবদুস সালাম, খায়রুল কবির খোকন, হাবিব-উন-নবী খান সোহেলসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
রিজভী বলেন, “একুশের চেতনা চির অম্লান। দেশের জনগণকে একুশের চেতনাই ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করবে।” এরপর ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ বিএনপির অঙ্গসংগঠনগুলো পর্যায়ক্রমে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের অংশগ্রহণ
শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা জানায় বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), গণঅধিকার পরিষদ, গণফোরাম, বাসদ, গণসংহতি আন্দোলন, মুক্তি কাউন্সিল, জাতীয় প্রেস ক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠন।
শহিদ মিনার থেকে বইমেলায় জনস্রোত
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে অনেকেই একুশে বইমেলায় যান। বইমেলায় ছিল উপচে পড়া ভিড়। অনেকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন এলাকা, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থানে।
নগর ও গ্রাম— সর্বত্র শহিদদের শ্রদ্ধা
শুধু কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার নয়, দেশের প্রতিটি শহিদ মিনার ফুলে ফুলে ভরে ওঠে। প্রত্যন্ত গ্রামেও অস্থায়ী শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। খালি পায়ে সারিবদ্ধ মানুষ হেঁটেছেন শহিদদের স্মরণে, তাদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে।
একুশের চেতনা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া
বাংলাদেশের মতো বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে। জাতিসংঘের স্বীকৃতির ফলে এখন এটি শুধু বাঙালির নয়, বিশ্বের সব ভাষাভাষীর অধিকার রক্ষার দিন।
নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থা
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. সরোয়ার জানান, “সাতটি পয়েন্টে রোড ব্লক বসিয়ে যান চলাচল বন্ধ রাখা হয়। নিরাপত্তার জন্য মেটাল ডিটেক্টর ও আর্চওয়ে বসানো হয়েছিল।”
একুশের চেতনায় ভবিষ্যতের অঙ্গীকার
মাতৃভাষার জন্য যারা প্রাণ দিয়েছেন, তাদের আত্মত্যাগ জাতিকে নতুন করে প্রেরণা দেয়। একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রচলন এবং বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন শ্রদ্ধা জানাতে আসা বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
[দিগন্ত জার্নাল | সাম্যের আহ্বানে।]