বিদ্যুৎ খাতে সিন্ডিকেটের কারসাজি: ৮০০ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক - দিগন্ত জার্নাল

বিদ্যুৎ খাতে সিন্ডিকেটের কারসাজি: ৮০০ কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে বিতর্ক

দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:

বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন প্রকল্পে সিন্ডিকেটের প্রভাব এখনো বিদ্যমান। সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর সময় গড়ে ওঠা একটি ব্যবসায়িক চক্র বর্তমান সরকারের আমলেও প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করছে। অভিযোগ রয়েছে, এই সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য একটি কোম্পানি নিয়ম ভেঙে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) অধীনে ৮০০ কোটি টাকার প্রকল্প পাচ্ছে, যা বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হওয়ার কথা।

বিশেষ শর্তে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে ‘আইডিয়াল ইলেকট্রিক এন্টারপ্রাইজ’-কে

এই প্রকল্পের দরপত্রে অংশ নিয়েছিল আটটি কোম্পানি। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, বিশেষ শর্ত সংযোজন করে প্রতিযোগিতা সীমিত করা হয়েছে, যাতে শুধুমাত্র ‘আইডিয়াল ইলেকট্রিক এন্টারপ্রাইজ’ কাজটি পায়। এই শর্ত অনুযায়ী, দরপত্রের কারিগরি ও আর্থিক মানদণ্ড এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যাতে অধিকাংশ দেশীয় প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে না পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৩৩ কেভি জিআইএস সুইচগিয়ার প্যানেল প্লাগইন বসানোর শর্ত বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা বিশ্বব্যাংকের নীতিমালার বিরোধী। এর ফলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বেশ কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিতে পারেনি। আরইবি-র ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রকল্পের অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুসারে, এটি ওপেন টেন্ডার মেথড (OTM-ICT) পদ্ধতিতে হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়াই এটি পরিবর্তন করে এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে বিশেষ একটি প্রতিষ্ঠান সুবিধা পায়।

বিদেশি কোম্পানির ওপর নির্ভরশীলতা এবং দেশীয় শিল্পের ক্ষতি

বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পটির ডিজাইন এমনভাবে করা হয়েছে যাতে ৯০% সরঞ্জাম ভারতের একটি নির্দিষ্ট কোম্পানি থেকে আমদানি করতে হয়। অথচ বিশ্বব্যাংক প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় উদ্যোক্তা ও দেশীয় উৎপাদিত মালামালকে অগ্রাধিকার দেওয়ার শর্ত দিয়েছিল। কিন্তু আরইবি সেই শর্ত বাতিল করে দিয়েছে, যার ফলে দেশীয় শিল্প ক্ষতির মুখে পড়বে এবং সরকার রাজস্ব হারাবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আমদানি করা পণ্যের ক্ষেত্রে কাস্টমস শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য কর দিতে হবে না, ফলে বিদেশি কোম্পানিগুলো বড় ধরনের আর্থিক সুবিধা পাবে, যা রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর।

সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির বলেছেন, গত ১৭ বছরে কিছু গোষ্ঠী বিদ্যুৎ খাতে একচেটিয়া আধিপত্য কায়েম করেছিল। নতুন সরকার এই সিন্ডিকেট ভাঙতে চায় এবং প্রতিযোগিতা তৈরি করতে দরপত্রের নিয়মে পরিবর্তন আনতে কাজ করছে।

তিনি জানান, এই সিন্ডিকেটের তালিকা ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং দরপত্র শিডিউলে পরিবর্তন আনার কাজ চলছে। তিনি বলেন, ‘আইডিয়াল ইলেকট্রিক এন্টারপ্রাইজ’-এর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করা হবে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে।’

আইডিয়াল ইলেকট্রিক এন্টারপ্রাইজের বক্তব্য

তবে ‘আইডিয়াল ইলেকট্রিক এন্টারপ্রাইজ’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমান অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, ‘আমরা নিয়ম মেনেই দরপত্রে অংশ নিয়েছি এবং সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েছি। সিন্ডিকেটের অংশ নই, বরং বিদ্যুৎ খাতকে কিছু গোষ্ঠী ১৭ বছর ধরে জিম্মি করে রেখেছিল। তারা এখন আমাদের সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়াকে মেনে নিতে পারছে না, তাই মিথ্যা অভিযোগ করছে।’

তিনি আরও বলেন, তার প্রতিষ্ঠান দরপত্রের আর্থিক ও কারিগরি দুই ধাপেই রেসপন্সিভ হয়েছে এবং কোনো অনিয়ম করেনি।

বিশ্লেষকদের শঙ্কা: কারিগরি ও আর্থিক মানদণ্ডে গরমিল

বিশ্লেষকদের মতে, দরপত্রে আর্থিক ও কারিগরি মানদণ্ডের ক্ষেত্রে বেশ কিছু অনিয়ম রয়েছে:

  1. অর্থনৈতিক সামর্থ্য প্রশ্নবিদ্ধ – কোম্পানিটির গত তিন বছরে বার্ষিক টার্নওভার মাত্র ২৭.৪৯ মিলিয়ন ডলার এবং লিকুইড অ্যাসেট ৭২.৭২ মিলিয়ন ডলার। অথচ ৮০০ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা তাদের আছে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
  2. বিদেশি কোম্পানির সহযোগিতায় অভিজ্ঞতার সনদ – আইডিয়াল কোম্পানির অভিজ্ঞতা হিসেবে যে নথিপত্র দেওয়া হয়েছে, তাতে দেখা যায় তারা ভারতীয় একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেছে। কিন্তু টেন্ডারের নিয়ম অনুযায়ী, অভিজ্ঞতা যাচাইয়ের জন্য পৃথকভাবে কাজের পরিমাণ দেখানো বাধ্যতামূলক ছিল। অথচ পুরো অভিজ্ঞতা কৌশলে আইডিয়ালের নামে দেখানো হয়েছে, যা নিয়মবহির্ভূত।
  3. বিশেষ শর্তের কারণে প্রতিযোগিতা কমেছে – দরপত্রে এমন শর্ত রাখা হয়েছে যাতে অধিকাংশ দেশীয় প্রতিষ্ঠান যোগ্যতা হারিয়েছে, যা সরকারি প্রকিউরমেন্ট নীতিমালার পরিপন্থী।

রাজনৈতিক প্রভাব ও সিন্ডিকেটের যোগসূত্র

বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর ঘনিষ্ঠ কিছু ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে একচেটিয়া ব্যবসা করে আসছে। আইডিয়াল ইলেকট্রিক এন্টারপ্রাইজ সেই গোষ্ঠীর অন্যতম সদস্য।

অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রতিমন্ত্রীর প্রভাবশালী পিএস সেলিম আবেদ এই কোম্পানিকে সুবিধা পাইয়ে দিতেন। আগের সরকারে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেও প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি।

নীতিনির্ধারকদের সুস্পষ্ট পদক্ষেপের আহ্বান

বিদ্যুৎ খাতে স্বচ্ছতা আনতে এবং বিদেশি কোম্পানির আধিপত্য কমিয়ে স্থানীয় শিল্পকে রক্ষা করতে বিশেষজ্ঞরা সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে যদি বিদ্যুৎ খাতের পুরনো সিন্ডিকেট সক্রিয় থাকে, তাহলে দেশীয় ব্যবসায়ী ও সরকার উভয়েই ক্ষতির মুখে পড়বে। তাই নীতিনির্ধারকদের এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।

সরকার সিন্ডিকেট ভাঙতে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

an adbox will go here