শাহ মোহাম্মদ মারুফের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের তদন্ত চলছে
দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) যুগ্ম কমিশনার শাহ মোহাম্মদ মারুফের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। তার আয়কর নথিতে যেখানে সম্পদের পরিমাণ চার কোটি টাকার বেশি দেখানো হয়েছে, সেখানে বাস্তবে তার এবং তার স্ত্রীর নামে গড়ে তোলা সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩০ কোটি টাকার বেশি। এ নিয়ে আয়কর গোয়েন্দারা ইতোমধ্যে তদন্ত শুরু করেছেন, এবং প্রাথমিক তদন্তে এই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
২০১০ সালে ২৮তম বিসিএসের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যোগদানকারী শাহ মোহাম্মদ মারুফ বর্তমানে (৫ম গ্রেড) বেতন-ভাতা বাবদ প্রায় ৮০ লাখ টাকার সমপরিমাণ আয় করছেন। তবে তার আয়কর নথিতে এসব আয় ও তার ঘোষিত সম্পদের মধ্যে অসঙ্গতি দেখা গেছে। বিশেষ করে, তার পরিবার যে বারিধারা কূটনৈতিক এলাকায় ১২ কোটি টাকার একটি ফ্ল্যাটে বসবাস করছে, এটি সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। স্ত্রীর নামে ফ্ল্যাটটি কিনলেও, এর নিবন্ধন এখনও সম্পন্ন হয়নি। এমনকি, তার নামে-বেনামে আরও বেশ কিছু সম্পদ রয়েছে।
এ বিষয়ে আয়কর গোয়েন্দা ইউনিটের কমিশনার আব্দুর রকিব বলেন, “শাহ মোহাম্মদ মারুফের বিরুদ্ধে তদন্তের কাজ চলছে এবং শিগগিরই প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।” তবে তিনি এর বাইরে কিছু বলতে অপারগতা জানান। এছাড়া, এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন যে, তার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বর্তমানে বগুড়া কর অঞ্চলের সিরাজগঞ্জ সার্কেলে বহাল তবিয়তে চাকরি করছেন তিনি, যার কারণে এনবিআরের ভেতরে-বাইরে নানা প্রশ্ন উঠছে।
এদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মন্তব্য করেন, “কর কর্মকর্তারা যদি নিজেই অবৈধ উপার্জন করে থাকেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তির পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)কে আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।” তিনি আরও বলেন, “এ ধরনের কর্মকর্তাদের জন্য ন্যায় ও সততার সঙ্গে কর পরিশোধকারী সাধারণ নাগরিকদের জন্য কর অফিসে ঢোকা কঠিন হয়ে ওঠে।”
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শাহ মোহাম্মদ মারুফ তার স্ত্রী ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নামে আরও কিছু অবৈধ সম্পদ সংগ্রহ করেছেন। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে তার বিরুদ্ধে বিপুল সম্পদ গড়ার অভিযোগ রয়েছে, যা তদন্তাধীন। এছাড়া, ঢাকার বিভিন্ন স্থানে জমি ও ফ্ল্যাটের মালিকানাও রয়েছে তার। তার নামেই ব্যাংকে কোটি টাকা জমা রয়েছে, যা তার আয়কর নথির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
কর গোয়েন্দারা জানিয়েছেন, শাহ মারুফ এবং তার পরিবারের সদস্যদের নামে প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, তারা গোপালগঞ্জ, উত্তরায় এবং নিকুঞ্জে বেশ কিছু জমি কিনেছেন। এ ছাড়া, তার স্ত্রীর নামে একটি বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে, যার দাম ৮০ লাখ টাকা। এসব সম্পদ পর্যালোচনা করে কর গোয়েন্দারা জানান, তিনি এসব সম্পদ অর্জনের জন্য অবৈধ উপায় অবলম্বন করেছেন।
এ বিষয়ে সাবেক আয়কর কমিশনার ড. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, “যে কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। কোনো সরকারি কর্মকর্তা যদি চাকরি করে এত বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির মালিক হন, তবে তা অবৈধ উপার্জন ছাড়া আর কিছু হতে পারে না।”
এমন পরিস্থিতিতে, এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা এই বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য চাপ সৃষ্টি করছেন, তবে মারুফ এখনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল আছেন। এই ঘটনা সরকারের বিরুদ্ধে নানা প্রশ্ন তুলছে এবং এতে আরও একটি নতুন আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে, যে কোনো সরকারি কর্মকর্তা যদি অবৈধ উপার্জন করেন, তবে তার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
এ বিষয়ে তদন্তের কাজ চলছে এবং এই তদন্তের ফলাফল প্রকাশিত হলে, দেশের সরকারি কর্মকর্তা ও কর কর্মকর্তাদের মধ্যে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হবে।