জাল নোটবিরোধী অভিযান: কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ
দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:
ঈদ বা অন্যান্য উৎসব উপলক্ষে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জোরদার হয় জাল নোটবিরোধী মৌসুমি অভিযান। মাসখানেকের অভিযানে ধরা পড়ে চক্রের একাধিক মূল হোতাসহ অর্ধশত সদস্য। উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ জাল নোট, নকল বিদেশি মুদ্রা ও তৈরির সরঞ্জাম। দেখা যায়, গ্রেফতার ব্যক্তিদের বেশির ভাগই আগেও বিভিন্ন সময়ে ধরা পড়েছেন। বিচারিক বিলম্ব ও যথাসময়ে শাস্তি না হওয়ায় আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে জামিনে বেরিয়ে ফের একই কারবারে জড়িয়ে পড়েছেন।
২০০১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গত দুই যুগে দেশের বিভিন্ন থানায় জাল নোটসংক্রান্ত সাড়ে ৭ হাজার মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শুধু রাজধানীর ৫০টি থানায় হয়েছে ৭শর বেশি মামলা। এই ১৪ বছরে নিষ্পত্তি হওয়া মামলার সংখ্যা মাত্র ৪টি, আর সাজা হয়েছে মাত্র ১৩টিতে। বাকিগুলোর অধিকাংশ মামলা চার্জশিট প্রদান, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ কিংবা রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। এসব মামলায়, দু-একটি বাদে, সব আসামিই বর্তমানে জামিনে মুক্ত।
দুর্বল আইন, লঘু শাস্তি, মামলা পরিচালনায় মনিটরিং না থাকা, সাক্ষীর অভাব, সরকারি আইন কর্মকর্তাদের গাফিলতিসহ বিভিন্ন কারণে বছরের পর বছর অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে আছে জাল নোটসংক্রান্ত মামলাগুলো। দ্রুত নিষ্পত্তি ও যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে কখনোই এ চক্রকে রোধ করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে খসড়া আইনটি দ্রুত প্রণয়নসহ বিচার নিষ্পত্তি করতে হবে।
২০১৩ থেকে ২০২2 সাল পর্যন্ত ১০ বছরে ২ হাজার ৪৮৬টি নতুন মামলা হয়েছে। এই সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৯৭৭টি। ২০১৫ সালে সর্বাধিক ৪৩৯টি মামলা দায়ের হয়েছিল, কিন্তু সেবছর নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৪৯টি মামলা। অন্যান্য বছরগুলোতে নতুন মামলা দায়েরের সংখ্যা নিষ্পত্তির চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ছিল। ২০২৪ সালে নতুন ১২৪টি মামলাসহ মোট মামলা সংখ্যা ৬৯৪০টি, যার মধ্যে ১৫২টি নিষ্পত্তি হয়েছে। বর্তমানে ৬৭৮৮টি মামলা বিচারের জন্য অপেক্ষমাণ।
২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন থানায় মোট ৭০৮টি জাল নোট মামলা হয়েছে। এই সময়ে গ্রেফতার হয়েছেন ১ হাজার ৩০৭ জন, কিন্তু নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৪টি মামলা। চার্জশিট দেওয়া হয়েছে ৬৪৩টি মামলায়, এবং সাজা হয়েছে ১৩টি মামলায়।
আইনজীবীরা অভিযোগ করেন, অনেক ক্ষেত্রে জাল নোটসংক্রান্ত মামলাগুলো দুর্বলভাবে পরিচালিত হয়। জামিন লাভের সুবিধার্থে অপরাধীদের পক্ষ থেকে এজাহার দুর্বলভাবে লেখা হয়। চার্জশিট দেওয়ার সময় আসামিদের স্থায়ী ঠিকানা সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করা হয় না, ফলে আসামিরা জামিনে বেরিয়ে ঠিকানা পরিবর্তন করে ফেলেন।
এছাড়া, মামলার ফাঁকফোকর ছাড়াও জাল নোট কারবারিদের জামিনের জন্য আদালতে চক্রের নিজস্ব আইনজীবী রয়েছেন। আসামি পক্ষের আইনজীবীদের সঙ্গে কিছু পাবলিক প্রসিকিউটরের ঘনিষ্ঠতা থাকলে চুক্তিতে এসব চক্রের সদস্যদের জামিনে মুক্ত করা হয়। এর ফলে অপরাধীরা ধরা পড়লেও বা মামলা হলেও শাস্তি কার্যকর হয় না।
ডিবির একাধিক মামলার বিশ্লেষণ অনুসারে, একই চক্র একাধিকবার জাল নোটের কারবারে জড়িয়ে পড়ছে। হুমায়ুন কবির নামে একজন ব্যক্তি ২০০২ সাল থেকে ১০ বার গ্রেফতার হয়েছেন, এবং বর্তমানে ১৫ ও ১৬ মার্চে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়, যারা একাধিকবার গ্রেফতার হয়েছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) রেজাউল করিম মল্লিক বলেন, উৎসবের সময় জাল নোট কারবারিরা তৎপর হলে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়, তবে জামিনে বেরিয়ে ফের তারা একই কারবারে ফিরে আসে। তিনি দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি ও অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী মো. ফয়জুল্লাহ বলেন, বর্তমানে জাল নোট সংক্রান্ত অপরাধের বিচার দণ্ডবিধির ১৮৬০-এর ৪৮৯(ক)-(ঘ) ধারা এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪-এর ২৫(ক) ধারায় হয়। তবে এই আইনে শাস্তি দিতে হলে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হাজির করতে হয়, যা অনেক ক্ষেত্রে সাক্ষীদের ভয় দেখিয়ে আটকানো হয়। ২০১৫ সালে একটি আইনের খসড়া তৈরি করা হলেও এখনও নতুন আইন প্রণীত হয়নি।
সার্বিক সচেতনতা এবং শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য দ্রুত আইনের প্রণয়ন ও কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।