নতুন সরকার পাচ্ছে ভঙ্গুর অর্থনীতি, শুরুতেই বড় অর্থ সংকটের আশঙ্কা
নিজস্ব প্রতিবেদক। অর্থনীতি । বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
নতুন সরকারের সামনে স্বস্তিদায়ক নয় অর্থনৈতিক বাস্তবতা
মূল্যস্ফীতি, আইএমএফের শর্ত ও কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে সরকার
নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হতে যাওয়া নতুন সরকার কোনো স্বস্তিদায়ক অর্থনীতি পাচ্ছে না। বরং শুরুতেই তাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ভঙ্গুর, অস্থির ও চ্যালেঞ্জে ভরা অর্থনৈতিক বাস্তবতা।
দীর্ঘদিনের মন্দা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি এবং ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা—সব মিলিয়ে সরকার দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতেই বড় অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংকট সামলাতে কঠোর সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে নতুন সরকারকে নিতে হতে পারে বেশ কিছু অজনপ্রিয় ও কঠোর সিদ্ধান্ত। এর বড় অংশই আসবে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ)-এর শর্ত থেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংক, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে—অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হলে সংস্কারের বিকল্প নেই। তবে এসব সংস্কার বাস্তবায়ন রাজনৈতিকভাবে সহজ হবে না।
আইএমএফের চাপ এড়ানো কঠিন
আইএমএফের সঙ্গে ঋণ কর্মসূচির আওতায় সরকারকে যেসব শর্ত মানতে হচ্ছে, সেগুলো স্বল্পমেয়াদে জনজীবনে চাপ বাড়াতে পারে।
আইএমএফের প্রধান শর্তগুলো হলো—
- সুদের হার কমানো যাবে না
- জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে ভর্তুকি কমাতে হবে
- ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করতে হবে
এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন হলে মূল্যস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি জনঅসন্তোষও তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনিয়োগের পূর্বশর্ত
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, নির্বাচনের পর যদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসে, তাহলে বিনিয়োগে নতুন গতি আসতে পারে। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে দ্রুত অগ্রগতি প্রয়োজন কয়েকটি খাতে—
- গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ
- আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো
- ব্যবসা শুরুর প্রক্রিয়া সহজ করা
- সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে আনা
এসব ক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান—দুটোই বাধাগ্রস্ত হবে।
বাড়ছে রাজনৈতিক ব্যয়, বাড়ছে চাপ
নতুন সরকারের ওপর রাজনৈতিক ব্যয় বাড়ানোর চাপ থাকবে। সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়ন করলেও বাড়াতে হবে রাজস্ব আয়।
রাজস্ব না বাড়িয়ে ব্যয় বাড়ালে সরকারের ঋণনির্ভরতা আরও বেড়ে যাবে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে।
এর ফলে—
- ব্যাংক থেকে সরকারি ঋণ বাড়বে
- বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হবে
- নতুন বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে
সুদের হার কমানোর সুযোগ নেই
ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরেই সুদের হার কমানোর দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট করেছে—এই মুহূর্তে সুদ কমানোর সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদের হার ১০ শতাংশেই অপরিবর্তিত রেখেছে। আইএমএফও একই অবস্থানে রয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে না নামলে সুদের হার কমানো সম্ভব নয়। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮.৫৮ শতাংশ, ফলে ঋণের সুদ কমার সম্ভাবনা আপাতত নেই।
রাজস্ব ঘাটতি ও ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা
বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন,
“দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক মন্দার কারণে রাজস্ব আয় কমেছে। অন্যদিকে সরকারি ব্যয় বেড়েছে। ফলে নতুন সরকার বড় ঘাটতি নিয়েই দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে।”
তার মতে, ব্যাংক খাত দুর্বল থাকায় সরকার বড় অঙ্কের ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে অর্থপ্রবাহ আরও কমে যাবে।
মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্ক করে বলেছে, সামনে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নির্বাচন, রমজান এবং সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ফলে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়বে। এতে চাহিদা বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির হার আরও বাড়তে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হবে—
- টাকার অবমূল্যায়ন
- আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি
- বৈদেশিক দায় বাড়ার ঝুঁকি
ব্যাংকিং খাতে বড় সংস্কারের চ্যালেঞ্জ
নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো ব্যাংকিং খাত সংস্কার। খেলাপি ঋণ, তারল্য সংকট এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা—সবই সময়সাপেক্ষ ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই খাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে অর্থনীতির সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।
সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, নতুন সরকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে—
- রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা
- অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা
- রাজস্ব ব্যবস্থার সংস্কার
- উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ
- বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি
বিশ্বব্যাংকও বলছে, সংস্কার কার্যক্রম চালু রাখা এবং রাজস্ব আয় বাড়াতে পারলে বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে, নতুন সরকার এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে, যখন অর্থনীতি সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে। এই ভঙ্গুর অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হলে দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার, সাহসী সিদ্ধান্ত ও সময়োপযোগী সংস্কার ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।