আইএমএফ ঋণ নিয়ে অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশ, জুনে চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি ছাড়ের সম্ভাবনা
দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:
আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের (আইএমএফ) ঋণ শর্ত বাস্তবায়নে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সংস্থাটির কিছু শর্ত দেশের স্বার্থবিরোধী হওয়ায় এগুলো বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এর ফলে আইএমএফ ঋণের কিস্তি ছাড় ইতোমধ্যে তিন দফা পিছিয়েছে। আগামী জুনে চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তি একসঙ্গে ছাড়ের বিষয়ে আলোচনা চলছে।
আইএমএফ ঋণের মূল তিনটি শর্ত হলো—ডলারের দাম বৃদ্ধি, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং কর আদায় বৃদ্ধি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এসব শর্ত বাস্তবায়ন করলে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাবে এবং জনগণের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে। তাই সরকার এগুলো সহনীয় মাত্রায় বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে।
সূত্র জানায়, আগামী ৬ এপ্রিল আইএমএফ-এর একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে আসবে। তারা শর্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে সরকারের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নেবে। এরপর সংস্থাটির নির্বাহী পরিষদে জুনে ঋণের কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
২০২২ সালের আগস্টে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় আইএমএফ-এর কাছে ঋণ সহায়তা চায় বাংলাদেশ। দফায় দফায় আলোচনার পর ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি সরকারের সঙ্গে একটি ঋণচুক্তি সম্পাদিত হয়। এর আওতায় প্রথম কিস্তিতে ৪৭.৬৩ কোটি ডলার, দ্বিতীয় কিস্তিতে ৬৮.১০ কোটি ডলার এবং তৃতীয় কিস্তিতে ১১৫ কোটি ডলার পেয়েছে বাংলাদেশ। তবে ২০২৩ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চতুর্থ কিস্তির অর্থছাড় স্থগিত হয়ে যায়।
আইএমএফ-এর শর্ত বাস্তবায়নের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার, যিনি বর্তমানে গা ঢাকা দিয়েছেন। ফলে ঋণের শর্ত বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ঝুলে আছে।
সরকার একেবারে ঋণচুক্তি থেকে বেরিয়ে যেতে চাচ্ছে না, কারণ আইএমএফ-এর ঋণ পাওয়া গেলে অন্যান্য সংস্থার কাছ থেকে ঋণ পাওয়াও সহজ হয়। তবে ডলার সংকট কাটিয়ে ওঠার পর সরকার ঋণের প্রতি খুব বেশি আগ্রহী নয়। অন্যদিকে, বৈশ্বিকভাবে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় আইএমএফও শর্ত শিথিল করে বাংলাদেশকে ঋণ দিতে আগ্রহী।
আইএমএফ-এর অন্যতম প্রধান শর্ত ডলারের দাম বাড়ানো। সংস্থাটির মতে, এতে রপ্তানি আয় ও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়বে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, ডলারের দাম বাড়ালে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাবে, আমদানি খরচ বাড়বে এবং ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। এ কারণে সরকার এখনই ডলারের দাম বাড়াতে চাচ্ছে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি। আইএমএফ চায় এ খাতে ভর্তুকি কমিয়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হোক। তবে সরকার বলছে, বিদ্যুতের দাম বাড়ালে শিল্প খরচ বাড়বে এবং পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে।
কর আদায় বাড়ানো নিয়েও আইএমএফের শর্ত রয়েছে। তবে সরকার বলছে, জনগণের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে কর নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব বাড়ানো হবে। আগামী বাজেটে এ বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে।
সরকার ও আইএমএফের মধ্যকার আলোচনা চলমান রয়েছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে জুনে চতুর্থ ও পঞ্চম কিস্তির অর্থ ছাড় হতে পারে, যা ১২০ কোটি ডলারের বেশি হতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে আলোচনার ফলাফলের ওপর।