এসএমই খাতের বিকাশে প্রয়োজন নীতি সহায়তা ও বাস্তবমুখী উদ্যোগ
দিগন্ত জার্নাল অর্থনীতি
শনিবার , (২৪ মে ২০২৫) দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই) এক শক্তিশালী স্তম্ভ হলেও যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে পিছিয়ে পড়ছে এই সম্ভাবনাময় খাত। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং আয়বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সত্ত্বেও এই খাত এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
বর্তমানে দেশে প্রায় ১ কোটি ১৮ লাখ এসএমই কোম্পানি রয়েছে, যেখানে কর্মসংস্থান হয়েছে ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষের। শিল্প খাতে কর্মসংস্থানের ৮৭ শতাংশই আসে এই খাত থেকে। অথচ ২০২১-২২ অর্থবছরে জিডিপিতে এ খাতের অবদান মাত্র ৭.৩৫ শতাংশ, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। পাকিস্তানে এই হার ৪০ শতাংশ, ভারতে ৩৭, শ্রীলঙ্কায় ৫২ এবং চীনে ৬০ শতাংশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রথম প্রান্তিকে দেশে বেকারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫ লাখ ৯০ হাজার, যেখানে ২০২৩ সালের শেষ প্রান্তিকে এটি ছিল ২৩ লাখ ৫০ হাজার। শুধু স্নাতক ডিগ্রিধারীদের মধ্যেই প্রতি ১০০ জনে ৪৭ জন বেকার। প্রতিবছর প্রায় ২২ লাখ কর্মক্ষম ব্যক্তি শ্রমবাজারে প্রবেশ করে, এর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ উপযুক্ত কাজ পায় না।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এসএমই খাতের যথাযথ উন্নয়ন হলে বেকারত্ব নিরসনে বড় ভূমিকা রাখতে পারত। শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেন, “এসএমই খাত দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এ খাতে উদ্যোক্তারা তাদের লাভের ৩০ শতাংশ পুনরায় বিনিয়োগ করেন।”
বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল ফিনডেক্স ডাটাবেজ অনুযায়ী, নারী-মালিকানাধীন এসএমইর জন্য ১.৭ ট্রিলিয়ন ডলারের তহবিল ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশে এসএমই খাতে প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে অর্থায়নের অভাব, প্রযুক্তি সীমাবদ্ধতা, অবকাঠামো সংকট, বাজার প্রতিযোগিতা এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা।
আরকে ফ্যাশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কবির উদ্দিন আহমেদ বলেন, “ব্যবসা শুরু করতে গিয়ে আমরা বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছি। বিশেষ করে ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া কঠিন। কর, লাইসেন্সিং ও নিবন্ধন প্রক্রিয়া জটিল হওয়ায় অনেক উদ্যোক্তা নিরুৎসাহিত হন।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকে সিএসএমই ঋণ বিতরণ হয়েছে ২ লাখ ৮২ হাজার ৮৯৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১৯.১৪ শতাংশ। ২০২৯ সালের মধ্যে এই হার ২৭ শতাংশে উন্নীত করার নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবায়ন আশানুরূপ নয়।
এসএমই ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন মো. মুসফিকুর রহমান বলেন, “এ খাতের উন্নয়নে ১৪০টি প্রস্তাব বাজেট প্রণয়নকারীদের কাছে দেওয়া হয়েছে। আমরা নীতি সহায়তা ও উদ্যোক্তা উন্নয়নে কাজ করছি। তবে ১ কোটি ১৮ লাখ উদ্যোক্তার তুলনায় সরাসরি সুবিধাভোগীর সংখ্যা মাত্র ২ লাখ।”
ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, “বাংলাদেশে জিডিপিতে এসএমইর অবদান প্রতিবেশী দেশের তুলনায় কম হলেও উন্নয়নের জন্য এই অবদান বাড়ানো জরুরি।”
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, এসএমই খাতের বিকাশে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে—জামানতবিহীন ঋণ ও ভর্তুকি প্রদান, দক্ষতা উন্নয়নে প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল মার্কেটপ্লেসে প্রবেশে সহায়তা, কর ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করা এবং প্রদর্শনীর মাধ্যমে বাজার সম্প্রসারণ।