হাসিনা সরকারের ঘনিষ্ঠ ৮ ব্যবসায়ী গ্রুপ পাচার করেছে হাজার হাজার কোটি টাকা - দিগন্ত জার্নাল

হাসিনা সরকারের ঘনিষ্ঠ ৮ ব্যবসায়ী গ্রুপ পাচার করেছে হাজার হাজার কোটি টাকা

দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:

বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের সাথে সম্পর্কিত ৮টি বৃহত্তর ব্যবসায়ী গ্রুপের বিরুদ্ধে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা পাচার করার অভিযোগ উঠেছে। এ গ্রুপগুলো বিদেশে বিভিন্ন কোম্পানি গঠন করে এই পাচারকৃত টাকায় বিনিয়োগ করেছে, যার ফলে তারা আন্তর্জাতিক বাজারে বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। এই গ্রুপগুলোর মধ্যে রয়েছে সামিট গ্রুপ, জেমকম গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, আরামিট গ্রুপ, নাসা গ্রুপ এবং বেক্সিমকো গ্রুপ।

তদন্তে জানা গেছে যে, এসব গ্রুপ যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যান্ড, ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সাইপ্রাস, কানাডা, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, স্লোভাকিয়া, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস, আইল অব ম্যানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিপুল পরিমাণে বিনিয়োগ করেছে। এসব সম্পদ পাচার করে তারা নিজেদের জন্য বিপুল ধন-সম্পদ সংগ্রহ করেছে, কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতি কিংবা জনগণের কোনো উপকারে আসেনি।

এই ব্যবসায়ী গ্রুপগুলো আমদানি-রপ্তানির আড়ালে বিভিন্ন অবৈধ পন্থায় দেশের অর্থ পাচার করেছে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, পাচার করা টাকা দেশের বিভিন্ন ব্যাংক ও সরকারি প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ, রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার মাধ্যমে সংগৃহীত হয়েছে। এসব টাকার মাধ্যমে তারা বিদেশে সিক্রেট কোম্পানি গঠন করেছে এবং জমি, রিয়েল এস্টেট, হোটেলসহ নানা রকমের ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছে।

সম্প্রতি, একাধিক দেশি-বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা এই বিষয়টির তদন্ত শুরু করেছে। তদন্তে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে এসব গ্রুপের শেল কোম্পানির তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রুপগুলোর মালিকেরা এই শেল কোম্পানির মাধ্যমে দেশের বাইরে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গড়ে তুলেছেন। যেমন, সামিট গ্রুপের বিদেশি ব্যবসা, বিশেষ করে সিঙ্গাপুর ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে নানা ধরনের সম্পত্তির সন্ধান পাওয়া গেছে। একইভাবে, জেমকম গ্রুপের সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে ব্যাপক বিনিয়োগের তথ্য উঠে এসেছে।

এস আলম গ্রুপের ব্যাপারে তদন্তে উঠে এসেছে যে, তারা সিঙ্গাপুর, কানাডা, মালয়েশিয়া এবং সাইপ্রাসে বিপুল পরিমাণে বিনিয়োগ করেছে। সিঙ্গাপুরে একাধিক পাঁচতারকা মানের হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে এবং একটি ট্রেডিং কোম্পানির খোঁজও পাওয়া গেছে। তবে এই ব্যবসাগুলোর পুঁজি কোথা থেকে এসেছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। আরও উল্লেখযোগ্য যে, এস আলম গ্রুপের পরিচালকরা সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন।

সিকদার গ্রুপের নামও এসেছে এই তদন্তে, যেখানে তারা আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে বিদেশে টাকা পাচার করেছে। এর মধ্যে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রে তাদের নামকরা সম্পত্তি রয়েছে। সরকার বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতায় এই ব্যাপারে আরও বিস্তারিত তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।

অরিয়ন গ্রুপের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তারা দেশ থেকে টাকা পাচার করে বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করেছে। এতে সিআইডি ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে এই গ্রুপের মালিকেরা বিদেশে নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে তাদের ব্যবসা গড়ে তুলেছেন। এই বিষয়ে তদন্ত চলছে।

আরামিট গ্রুপ, যা আওয়ামী লীগ সরকারের ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাভেদের মালিকানাধীন, তার বিরুদ্ধে ৫৭৮টি বিদেশি সম্পত্তির তথ্য উদ্ধার করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ২২৮টি সম্পত্তি সংযুক্ত আরব আমিরাতে এবং ৩৪৩টি যুক্তরাজ্যে পাওয়া গেছে।

নাসা গ্রুপের মালিক নজরুল ইসলাম মজুমদার বিদেশে ৬৭০ কোটি টাকার সম্পদ পাচার করেছেন। যুক্তরাজ্য, হংকং, আইল অব ম্যান ও জার্সিতে তাদের ১৮টি শেল কোম্পানি রয়েছে। এসব সম্পত্তির মাধ্যমে তারা বিদেশে বড় বিনিয়োগ করেছে এবং এসব বিষয়েও তদন্ত চলছে।

বেক্সিমকো গ্রুপ, যা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেসরকারি খাতবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন, তার বিরুদ্ধে ১,১৪০ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ উঠেছে। এসব টাকা লন্ডন, দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করা হয়েছে এবং এই গ্রুপের নামে বিদেশে ৫টি শেল কোম্পানি গঠন করা হয়েছে।

আইনি পদক্ষেপ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এছাড়া, সব গ্রুপের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং পাচারকৃত সম্পদ উদ্ধারে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (এমএলএআর) তৈরি করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে এসব দেশীয় ও আন্তর্জাতিক তদন্ত কার্যক্রমের মাধ্যমে সম্পদ উদ্ধার করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকার এই পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং বিদেশে পাচারকৃত অর্থ ও সম্পত্তি উদ্ধারের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দাবি করছে। তবে, এসব বিদেশি বিনিয়োগের পেছনে দেশের সরকার এবং নিয়ন্ত্রণ সংস্থার অজ্ঞতা এবং দুর্বলতা প্রশ্নবিদ্ধ।

an adbox will go here