বাংলাদেশে ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন লুটপাট, খেলাপি ঋণ বাড়ছে - দিগন্ত জার্নাল

বাংলাদেশে ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন লুটপাট, খেলাপি ঋণ বাড়ছে

দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:

বাংলাদেশের ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোতে নজিরবিহীন লুটপাট ও ঋণ কেলেঙ্কারি সংঘটিত হয়েছে, যার ফলে দেশের অর্থনীতি আজ মারাত্মক সংকটে পড়েছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের আমলে বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠী রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যার অধিকাংশই এখন খেলাপি হয়ে গেছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এই অবস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ব্যর্থতা ও নীরব দর্শকের ভূমিকার কারণেই সৃষ্টি হয়েছে। শুধু তাই নয়, নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ঋণ অনুমোদন ও বিতরণের মাধ্যমে সংশ্লিষ্টরা নিজেরাও লাভবান হয়েছে। এর ফলে দেশের অর্থনীতি আজ খাদের কিনারায় পৌঁছেছে, ব্যাংকের তারল্য প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। বর্তমানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে সাড়ে তিন লাখ কোটি টাকায়, যার ৭২ শতাংশ আটকে আছে ১১টি ব্যবসায়ী গ্রুপের কাছে। পাশাপাশি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকায়।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এর তদন্তে উঠে এসেছে যে, এসব ব্যবসায়ী গ্রুপ বিভিন্ন কৌশলে ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নিয়েছে, যার অধিকাংশই বিদেশে পাচার করা হয়েছে। বিশেষভাবে ১০টি বড় শিল্পগ্রুপের বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ব্যাপক তদন্ত করছে, যার মধ্যে রয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ, সামিট গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, আরামিট গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, জেমকন গ্রুপ এবং আরও কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান। এসব গ্রুপের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঋণ পেয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপ, যাদের নামে-বেনামে ঋণের পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বর্তমানে এই গ্রুপের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫৩ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে সুদ মওকুফের হিসাব অন্তর্ভুক্ত নয়। তারা ১৬টি ব্যাংক ও সাতটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়েছে, যার ফলে বিশেষ করে জনতা ব্যাংক আজ চরম সংকটে পড়েছে।

এস আলম গ্রুপের মোট ঋণের পরিমাণ দুই লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে দেড় লাখ কোটি টাকাই খেলাপি হয়ে গেছে। তদন্তে দেখা গেছে, এই অর্থের বড় অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে, ফলে তা আদায় হওয়ার সম্ভাবনা কম। ইসলামী ব্যাংক থেকে তারা একাই ঋণ নিয়েছে এক লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকা, আর ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে নিয়েছে ৪৫ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা। এছাড়া নাসা গ্রুপের মোট ২১ হাজার কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ১১ হাজার কোটি টাকা ইতোমধ্যে খেলাপি হয়েছে। তাদের ঋণের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে, কারণ তারা বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করেছে, কিন্তু সেই অর্থ দেশে ফেরত আনছে না।

সিকদার গ্রুপের নামে-বেনামে সাত হাজার ২৯০ কোটি টাকা ঋণের তথ্য পাওয়া গেছে, যা আগে ধারণার চেয়ে অনেক বেশি। তাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দুই হাজার ৯০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। একইভাবে নাবিল গ্রুপের মোট ঋণের পরিমাণ ১৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যার মধ্যে সাত হাজার কোটি টাকার ঋণের ক্ষেত্রে জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে। ইতোমধ্যে ১১০০ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে গেছে এবং এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এদিকে সামিট গ্রুপ, আরামিট গ্রুপসহ আরও কয়েকটি বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর ঋণের বিশাল অংশ খেলাপি হওয়ার পথে রয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এছাড়া ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর পরিবার তাদের মালিকানাধীন ইউসিবি ব্যাংক থেকে সরাসরি ২০০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা খেলাপি হয়ে গেছে। পাশাপাশি কাগুজে কোম্পানি খুলে ১৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে, যার মধ্যে চার হাজার কোটি টাকা ইতোমধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। এসব ঋণও মূলত বিদেশে পাচার করা হয়েছে, ফলে তা আদায় করার সম্ভাবনা নেই।

একের পর এক ব্যাংক কেলেঙ্কারির মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রুপ হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করেছে। জনতা ব্যাংক থেকে এননটেক্স গ্রুপ ৭৭৫৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে প্রায় পুরোপুরি খেলাপি হয়ে পড়েছে। ক্রিসেন্ট লেদার ৫০০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা ফেরত দেয়নি, ফলে এই অর্থও এখন খেলাপি হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। সোনালী ব্যাংকের আলোচিত হলমার্ক গ্রুপ জালিয়াতির মাধ্যমে ৪০০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে, যার প্রায় সবটুকুই খেলাপি হয়ে গেছে। একইভাবে বেসিক ব্যাংকে ৫০০০ কোটি টাকার জালিয়াতি হয়েছে, যার অধিকাংশই আজ খেলাপি।

ব্যাংক খাতে এই ভয়াবহ লুটপাটের ফলে সাধারণ জনগণের আমানত মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। ব্যাংকের তারল্য সংকট চরম আকার ধারণ করেছে, ফলে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে এসেছে। খেলাপি ঋণের বোঝা বাড়তে থাকায় ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঋণ আদায় করা সম্ভব না হলে দেশের অর্থনীতির অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও সরকারের উচিত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, এখনই যদি ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো না হয়, তাহলে সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও গভীর সংকটে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত হয়ে ব্যাংক ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করতে হবে এবং সব অনিয়ম তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। অন্যথায়, জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ লুটপাট হতে থাকবে এবং দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়বে, যার চরম মূল্য দিতে হবে সাধারণ মানুষকেই।

an adbox will go here