মজুরি কম, বৈষম্য বেশি—শ্রমিকের ঘাম ঝরিয়ে এগোয় অর্থনীতি, পায় না ন্যায্য অধিকার
দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:
বৃহস্পতিবার, (১ মে ২০২৫) দেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিত দেওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান শ্রমিকদের। কৃষি, তৈরি পোশাক ও রেমিট্যান্স—এই তিন খাতকে অর্থনীতির চালিকাশক্তি বলা হলেও, সবখানেই দাঁড়িয়ে আছেন সস্তা শ্রমে জর্জরিত পরিশ্রমী মানুষগুলো। অথচ অর্থনীতি এগিয়ে গেলেও তাদের জীবনমান তেমন উন্নত হয়নি। মে দিবসে যখন শ্রমিকদের কথা ঘটা করে বলা হয়, তখনই চোখে পড়ে—বাকি সময়টা তারা কতটা অবহেলিত। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও সংগঠকদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্রই উঠে এসেছে।
স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও দেশে ‘জাতীয় মজুরি কমিশন’ গঠিত হয়নি। বর্তমানে ১৪২টি খাত-উপখাতের মধ্যে ৮৪টিতেই কোনো ন্যূনতম মজুরি নেই। যেসব খাতে মজুরি নির্ধারিত, সেখানেও খাতভেদে বিশাল পার্থক্য। কোনো খাতে মাসিক মজুরি মাত্র ২ হাজার টাকা, আবার অন্য খাতে ১৬ হাজার টাকার বেশি। তৈরি পোশাক খাতে নির্ধারিত সর্বনিম্ন মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা হলেও জীবিকা নির্বাহে তা যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন শ্রমিক সংগঠনগুলো।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর বাংলাদেশে অতিদরিদ্রের হার বেড়ে ৯ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এতে করে নতুন করে ৩০ লাখ মানুষ অতিদারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে। অর্থনীতির নিম্নগতি, প্রকৃত আয়ের হ্রাস এবং দুর্বল শ্রমবাজার—এই তিন কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের অর্থ সম্পাদক কাজী মো. রুহুল আমিন বলেন, দেশে এখনো অধিকাংশ শ্রমিক কর্মস্থলে নিরাপত্তা ও সম্মানজনক জীবনের নিশ্চয়তা পান না। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য নেই কোনো মজুরি কাঠামো বা আইনি সুরক্ষা। তিনি জানান, তাদের দাবি চারটি—শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন, ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, আইএলও কনভেনশন অনুসারে শ্রম আইন সংশোধন এবং সর্বজনীন রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা।
অর্থনীতিবিদ ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, করোনার পর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনীতির গতি রুদ্ধ করেছে। শিক্ষার হার বাড়লেও শিক্ষার মান বাড়েনি, ফলে তৈরি হচ্ছে দক্ষতাহীন শিক্ষিত বেকার। তিনি বলেন, “এই বিশাল জনশক্তিকে বোঝা না বানিয়ে সম্পদে রূপান্তর করতে হলে বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে।”
সিপিডির হিসাবে, প্রতিবছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে ২২ লাখ মানুষ। কিন্তু আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে মাত্র ৬ লাখ কর্মসংস্থান। ফলে ক্রমাগত বেকারত্ব বাড়ছে। সিপিডির গবেষণা অনুযায়ী দেশের ৮৫ শতাংশ শ্রমিক কাজ করছে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে, যাদের বেশিরভাগই নিম্ন মজুরি, নিরাপত্তাহীনতা এবং শ্রম আইনের বাইরে অবস্থান করছে।
শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন বলছে, গত এক দশকে ৮ হাজার ২৯৮ জন শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন প্রায় ৫ হাজার ৬০০ জন। ২০২৪ সালেই মারা গেছেন ৮২০ জন। অথচ অধিকাংশ পরিবারই পায়নি উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ।
বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “শ্রমিক ছাড়া শিল্প বাঁচে না। তাই শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে রেশনিং ব্যবস্থার মতো দাবিগুলো আমরা যৌক্তিক মনে করি।” তবে তিনি সতর্ক করে দেন, “অযৌক্তিক দাবি হলে, শিল্প মালিকেরা তা মেনে নেবেন না।”
গণমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, “আমরা জনশক্তি বোনাস পেয়েছি, এটি ইতিবাচক। কিন্তু দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের অভাবে এই বোনাস আমাদের জন্য বোঝা হয়ে উঠছে।”
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুসারে দেশে বর্তমানে শ্রমশক্তির পরিমাণ ৭ কোটি ৩৪ লাখের বেশি। তবে ১৫ বছর বা তার ঊর্ধ্ব বয়সি প্রায় ৪ কোটি ৬৯ লাখ মানুষ রয়েছেন শ্রমবাজারের বাইরে। অথচ সরকারিভাবে বলা হচ্ছে, দেশে বেকার মাত্র ২৬ লাখ। তবে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মানদণ্ড অনুসারে সপ্তাহে এক ঘণ্টাও কর্মরত না থাকলে তাকে বেকার হিসেবেই গণ্য করা হয়।
বর্তমানে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) আকার ৫৫ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে শ্রমিকদের সরাসরি অবদান থাকলেও, আয় বণ্টনের ক্ষেত্রে তারা বারবার বঞ্চিত হচ্ছেন। সর্বশেষ গিনি সহগ অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশ মানুষের আয় জাতীয় আয়ের ৪৪ শতাংশ। বিপরীতে পিছিয়ে থাকা ৫০ শতাংশ মানুষের ভাগ মাত্র ১৭ দশমিক ১ শতাংশ।
সাশ্রয়ী শ্রমিকের ঘাম ঝরিয়ে গড়ে ওঠা অর্থনীতিতে যখন অগ্রগতির দাবিতে ফুলঝুড়ি, তখন প্রান্তিক মানুষের চোখে ঘুম নেই, ভাত নেই, নিরাপত্তা নেই। তারা চায় সম্মান, ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ। এই দাবি শুধু মে দিবসের নয়—প্রতিদিনের।