পায়রা বন্দরকে ঘিরে ভবিষ্যতের মহাসড়ক: টেকসই উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা - দিগন্ত জার্নাল

পায়রা বন্দরকে ঘিরে ভবিষ্যতের মহাসড়ক: টেকসই উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা

দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:

সোমবার, ২৮ জুলাই ২০২৫ |বাংলাদেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর পায়রাকে ঘিরে গড়ে তোলা হয়েছে এক সুদূরপ্রসারী ও সমন্বিত মাস্টারপ্ল্যান—যার লক্ষ্য শুধু একটি বন্দর গড়ে তোলাই নয়, বরং গোটা দক্ষিণাঞ্চলকে রূপান্তরিত করা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র বা ইকোনমিক হাবে।

২০২৬ সালের জুলাইয়ের মধ্যেই এই বন্দরের প্রথম টার্মিনালের কার্যক্রম শুরু করার প্রত্যাশা করছে কর্তৃপক্ষ। এরই মধ্যে পায়রায় নির্মিত হয়েছে আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন ৬৫০ মিটার দীর্ঘ জেটি, প্রায় সাড়ে তিন লাখ বর্গমিটারের ব্যাকআপ ইয়ার্ড এবং ১০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের অত্যাধুনিক কনটেইনার ফ্যাসিলিটি (CFS)। আন্ধারমানিক নদীর ওপর সেতু নির্মাণ ও সংযোগ সড়কের কাজও এগিয়ে চলেছে।

একটি বন্দর, একাধিক সম্ভাবনা

পায়রা বন্দরকে কেন্দ্র করে তৈরি করা মাস্টারপ্ল্যানটি শুধুমাত্র অবকাঠামোগত উন্নয়নের রূপরেখা নয়, বরং এটি একটি বহুমাত্রিক উন্নয়ন কাঠামো—যেখানে গুরুত্ব পেয়েছে অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, পরিবেশ সুরক্ষা ও স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নয়ন। মাল্টি-পারপাস টার্মিনাল, কনটেইনার টার্মিনাল, ড্রাই ও লিকুইড বাল্কসহ নানাবিধ মেরিন টার্মিনাল গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনায় রয়েছে বন্দরকে সড়ক, রেল ও জলপথের সঙ্গে সুসংহত করা, শিল্পাঞ্চল, শিপইয়ার্ড ও সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, এবং বিদ্যুৎ-পানি-টেলিকমসহ প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি সংযোগ স্থাপন।

পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন—যেখানে চ্যালেঞ্জ, সেখানেই সম্ভাবনা

বন্দর ব্যবহারকারীদের মতে, পরিকল্পনা যতই নিখুঁত হোক, বাস্তবায়নে গতি না থাকলে সেই সম্ভাবনার অপমৃত্যু ঘটতে পারে। ড্রেজিং, নাব্য সংকট, যোগাযোগব্যবস্থার দুর্বলতা—এসব চ্যালেঞ্জকে জয় করতে পারলে পায়রা বন্দর হয়ে উঠবে দেশের অন্যতম অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি।

নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম শাখাওয়াত হোসেন বলেন,

“আমরা আশা করছি দুই-এক মাসের মধ্যে বন্দরের জন্য দুটি ড্রেজার অনুমোদন পাবে। বরিশাল পর্যন্ত রেললাইনের পরিকল্পনা ও চার লেন বিশিষ্ট মহাসড়ক নির্মাণের বিষয়েও অগ্রগতি হচ্ছে।”

উন্নয়ন হোক পরিবেশবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক

পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মাসুদ ইকবাল জানান,

“বন্দরের কার্যক্রমে যেন পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব না পড়ে, সে বিষয়ে আমরা অত্যন্ত সচেতন। টেকসই উন্নয়নই আমাদের মূল লক্ষ্য।”

স্থানীয় ও পরিবেশ–নির্ভর খাতগুলো নিয়েও বিশেষভাবে সতর্ক পরিকল্পনাকারীরা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পটুয়াখালীর উপপরিচালক এইচএম শামীম এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী যথাক্রমে কৃষি ও মৎস্য খাতের সুরক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বিশ্বমানের পরিকল্পনা, বিশ্বস্ত উপস্থাপনা

এ মাস্টারপ্ল্যানটি প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধীন বিআরটিসি এবং নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আন্তর্জাতিক পরামর্শক সংস্থা রয়্যাল হাসকোনিং ডিএইচভি। ২০১৯ সালে চুক্তি স্বাক্ষরের পর আটটি ধাপে দুই প্রতিষ্ঠানের শতাধিক বিশেষজ্ঞ এই মাস্টারপ্ল্যান প্রস্তুত করেন।

রয়্যাল হাসকোনিং ডিএইচভির টিম লিডার মেনো মুইজ বলেন,

“এটি কেবল অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পরিকল্পনা নয়, বরং একটি টেকসই, দায়িত্বশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কাঠামোর পথপ্রদর্শক।”

যদি বাস্তবায়ন হয় নিখুঁত…

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক মো. মামুনুর রশীদ এবং কাস্টমস ক্লিয়ারিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মিজানুর রহমান উভয়েই মনে করেন, পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়ন হলে এ বন্দর ব্যবসার নতুন দিগন্ত খুলে দেবে।

বরিশাল চেম্বার অব কমার্সের সাবেক সভাপতি এবায়েদুল হক চাঁন বলেন,

“প্রথমে কিছু ভুল হওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের এগিয়ে যেতে হবে ভবিষ্যতের দিকে। আমি মনে করি, ড্রেজিংয়ের কাজগুলো নৌবাহিনীকে দিলে দ্রুত ও দক্ষতা বাড়বে।”

পায়রা বন্দর নিয়ে গৃহীত মাস্টারপ্ল্যান যদি সময়মতো, সুনির্দিষ্টভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা শুধু একটি বন্দর নয়, বরং হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও অঞ্চলভিত্তিক সমৃদ্ধির নতুন প্রতীক।

an adbox will go here