ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ নবায়ন: বাড়ছে ঝুঁকি
দিগন্ত জার্নাল ডেস্ক:
২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মাত্র ৯ মাসে ব্যাংক খাতে ২০ হাজার ৭৩২ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নবায়ন করা হয়েছে, যা ২০২৩ সালের একই সময়ে ছিল ১৮ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। কিন্তু এত প্রচেষ্টার পরও ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমেনি, বরং নতুন রেকর্ড গড়ে তা বেড়েই চলেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। তবে অনানুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এ ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আগের সরকার খেলাপি ঋণ কম দেখাতে বিভিন্ন ছাড়ের ব্যবস্থা করেছিল। ২০২২ সালে ঋণ পুনঃতফশিলের নীতিমালা সহজ করে পুরো প্রক্রিয়া ব্যাংকের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ৫০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ চার দফায় ২৯ বছরের জন্য পুনঃতফশিলের সুযোগ পায় এবং ডাউনপেমেন্ট ধরা হয় মোট বকেয়ার মাত্র ২.৫ শতাংশ।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের প্রথম ৯ মাসে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ পুনঃতফশিল করেছে বেসরকারি ব্যাংকগুলো—যার পরিমাণ ১৭ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো পুনঃতফশিল করেছে ১ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা এবং বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর পরিমাণ ১ হাজার ১২০ কোটি টাকা। তবে বিদেশি ব্যাংকগুলো কোনো খেলাপি ঋণ পুনঃতফশিল করেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিদেশি ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর বিধিনিষেধ মেনে চলে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকার কারণে তাদের খেলাপি ঋণ তুলনামূলকভাবে কম। অন্যদিকে, স্থানীয় ব্যাংকগুলো রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর কাছে বড় অঙ্কের ঋণ দিয়ে তা আদায়ে ব্যর্থ হচ্ছে, ফলে পুনঃতফশিলের পরিমাণও বাড়ছে।
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, এখন আর আগের মতো তথ্য লুকানো হয় না, ফলে খেলাপি ঋণ ও পুনঃতফশিল উভয়ই বাড়ছে, যা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি তৈরি করছে এবং বৈদেশিক বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের সাবেক এমডি শফিকুর রহমানের মতে, ব্যবসা-বাণিজ্যের অবনতি ও অতিরিক্ত ঋণ ছাড়ের কারণে খেলাপি ঋণ ও পুনঃতফশিলের হার বেড়েছে। তিনি পরামর্শ দেন, ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ছাড় বা কঠোর নীতির পরিবর্তে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের এমডি মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ বলেন, উচ্চ সুদহার, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্যবসায়ীরা চাপে পড়েছেন। ফলে তারা ঋণ পরিশোধ করতে না পেরে পুনঃতফশিলের দিকে ঝুঁকছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, বারবার ঋণ পুনঃতফশিলের সুবিধা দিয়ে প্রকৃত অর্থে সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সাল পর্যন্ত পুনঃতফশিল করা ঋণের পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৮৮ হাজার ৫৪০ কোটি টাকা, যার ১৮.৭০ শতাংশ পুনরায় খেলাপি হয়ে গেছে। অর্থাৎ, পুনঃতফশিলের মাধ্যমে যে ঋণগুলো নিয়মিত করা হয়েছিল, তার বড় অংশই আবার পরিশোধে ব্যর্থ হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন, ব্যাংক খাতে লাগামহীন ঋণ নবায়নের প্রবণতা বন্ধ না হলে সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর নীতিমালা ছাড়া ব্যাংক খাতের এ সংকট নিরসন কঠিন হবে।